অনন‍্য-বাংলা : একটি ব‍্যাকরণের ব্লগ

Friday, September 28, 2018

অব‍্যয় পদের সংজ্ঞা ও শ্রেণিবিভাগ

বিষয়সূচি : অব‍্যয়ের সংজ্ঞা ও ধারণা। অব‍্যয়ের শ্রেণিবিভাগ। 


অব‍্যয়ের সংজ্ঞা ও ধারণা


সংস্কৃতে অব‍্যয় বলতে বোঝায়, যার ব‍্যয় বা পরিবর্তন নেই। অর্থাৎ, ক্রিয়ার কাল, কর্তার পুরুষ, লিঙ্গ, বচন পাল্টে গেলেও যার রূপ বদলাবে না, কোনো বিভক্তি‌ও গ্রহণ করবে না, তাকে অব‍্যয় বলে। কিন্তু বাাংলা ব‍্যাকরণে অব‍্যয়ের এই 
সংজ্ঞাটি গ্রহণ করার অসুবিধা আছে। কারণ বা‌ংলায় অব‍্যয় রূপে যে পদগুলি গণ‍্য হয় তারা অনেকেই বিভক্তি-যোগে তৈরি হয়। 

অব‍্যয়ের সংজ্ঞায় ভাষাচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, বাক‍্যগত উক্তিকে এবং বাক‍্যস্থ পদগুলির পারস্পরিক সম্বন্ধকে স্থান, কাল, পাত্র ও প্রকার বিষয়ে পরিস্ফুট করে দেয় যে পদগুলি, তাদের অব‍্যয় বলে। 

অব‍্যয়ের এই সংজ্ঞাটি থেকে আমরা বলতে পারি, অব‍্যয়ের কাজ হল বাক‍্যে উপস্থিত পদ, বাক‍্যাংশ (Phrase) ও উপবাক‍্যগুলির (Clause) মধ‍্যে পারস্পরিক সম্পর্ক স্থাপন করা এবং বাক‍্যের মধ‍্যে প্রকাশিত বিশেষ মনোভাব, অন্তর্ভাব, আবেগ, ব‍্যঞ্জনা, ইত‍্যাদি‌কে পরিস্ফুট করা।



অব‍্যয়ের শ্রেণিবিভাগ


আচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় অব‍্যয়কে দু'ভাগে ভাগ করেছেন : সম্বন্ধ-বাচক ও মনোভাব-বাচক। তাঁর এই শ্রেণিবিভাগ আমাদের মতে সর্বাংশে গ্রহণযোগ্য। 
কিন্তু বর্তমানে বাংলায় অব‍্যয়ের শ্রেণিবিভাগ করা হয় সাধারণত ৪ ভাগে। 
১) অনন্বয়ী ২) পদান্বয়ী ৩) সমুচ্চয়ী ও ৪) ধ্বন‍্যাত্মক


১: অনন্বয়ী অব‍্যয়


যে অব‍্যয়গুলি বাক‍্যের মধ‍্যে কোনো প্রকার সম্বন্ধ স্থাপনে ভূমিকা গ্রহণ করে না, তাদের অনন্বয়ী অব‍্যয় বলে। অর্থাৎ এই অব‍্যয়গুলি বাক‍্যে উপস্থিত থেকে সম্পর্ক-স্থাপন ছাড়া অন‍্যান‍্য কাজগুলি করে থাকে। যেমন : সম্বোধন, আবেগ-প্রকাশ, মনোভাব-প্রকাশ, অলংকরণ ইত্যাদি।

অনন্বয়ী অব‍্যয়ের প্রধান শ্রেণিগুলি নিচে আলোচিত হল।

আলংকারিক অব‍্যয়


যে অব‍্যয়গুলি স্পষ্ট কোনো অর্থ বহন করে না কিন্তু বাক‍্যের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে এবং অতি সূক্ষ্ম ভাবে বাক‍্যের ব‍্যঞ্জনাকে সামান‍্য পরিবর্তিত করে, তাদের আলংকারিক অব‍্যয় বা বাক‍্যালংকার অব‍্যয় বলে। এই অব‍্যয়ের অপর নাম নিরর্থক অব‍্যয়। 

যেমন : একবার নাচো তো দেখি। (তো) তুমি কিন্তু কাজটা ভালো করলে না। (কিন্তু) সাধারণ ভাবে 'কিন্তু' সমুচ্চয়ী অব‍্যয়ের মধ‍্যে পড়ে কিন্তু উপরোক্ত উদাহরণে এটি আলংকারিক অব‍্যয়। কারণ এখানে 'কিন্তু' বাদ দিলেও বাক‍্যের মূল অর্থটি প্রকাশিত হয়। তবে সেক্ষেত্রে বক্তার মনের অভিমান বা অনুযোগের সুরটি আর ধরা পড়ে না। বাক‍্যটি আবেগশূন‍্য বিবৃতি হয়ে ওঠে।


সম্বোধন-সূচক অব‍্যয়


যে অব‍্যয়গুলি কাউকে সম্বোধন করার কাজে ব‍্যবহৃত হয়, তাদের সম্বোধন-সূচক অব‍্যয় বলে। সম্বোধন-সূচক অব‍্যয় আর সম্বোধন পদ কিন্তু এক জিনিস নয়। সম্বোধন পদ কারক অধ‍্যায়ে আলোচিত হবে।

সম্বোধন-সূচক অব‍্যয়ের উদাহরণ : ওহে, ওগো, ওলো, রে, ওরে, হে ইত্যাদি।

আবেগসূচক অব‍্যয়


যে অব‍্যয়গুলি‌র দ্বারা বক্তা‌র মনের আবেগ বা মানসিক অবস্থা বোঝানো হয়, তাদের আবেগসূচক অব‍্যয় বলে। আবেগসূচক অব‍্যয়কে আবেগের নাম অনুসারে শ্রেণিবিভক্ত করা হয়। যেমন :
বিস্ময়সূচক : অ্যাঁ, সে কি 
ক্রোধ সূচক : তবে রে
ঘৃণাসূচক: ছিঃ
বিরক্তি‌সূচক: আঃ
যন্ত্রনা‌সূচক : উঃ
লজ্জা‌সূচক : মরি মরি
আনন্দ‌সূচক : হুররে
ভয়সূচক : মাগো
করুণাসূচক : আহা রে

এই প্রসঙ্গে মনে রাখতে হবে, আবেগসূচক অব‍্যয়গুলির কয়েকটি এমন আছে যারা একাধিক আবেগ প্রকাশ করতে পারে‌। যেমন, 'আঃ' অব‍্যয়টি বিরক্তি‌ও প্রকাশ করে, যন্ত্রনা‌ও প্রকাশ করে, আরাম‌বোধ‌ও প্রকাশ করে।


সম্মতিজ্ঞাপক অব‍্যয়


এই অব‍্যয়গুলি বক্তার সম্মতি প্রকাশ করে। অর্থাৎ কেউ কোনো বিষয়ে রাজি হয়েছে বোঝায়।

যেমন : হ‍্যাঁ, হুঁ, ঠিক আছে, বেশ, আচ্ছা ইত্যাদি।


নিষেধাত্মক অব‍্যয়


এই অব‍্যয়গুলি বাক‍্যের ভাবকে নেতিবাচক ভাবে পরিণত করে।

যেমন : না, নে । 


অসম্মতিজ্ঞাপক অব‍্যয়


এই অব‍্যয়গুলি বক্তার অসম্মতি বোঝাতে ব‍্যবহৃত হয়।

যেমন : না, কক্ষণো না।


প্রশ্নবাচক অব‍্যয়


এই অব‍্যয়গুলি প্রশ্ন করার কাজে ব‍্যবহৃত হয়।

যেমন: কি ('কী' নয়। 'কী' সর্বনাম)



২: পদান্বয়ী অব‍্যয়


যে অব‍্যয়গুলি বাক‍্যস্থ পদগুলির মধ‍্যে অন্বয় বা সম্পর্ক স্থাপন করে, তাদের পদান্বয়ী অব‍্যয় বলে। পদান্বয়ী অব‍্যয় আসলে অনুসর্গগুলি। অনুসর্গ কখনও কখনও বিভক্তির বিকল্প হিসেবেও কাজ করে। তবে আচার্য সুনীতিকুমার অনুসর্গকে অব‍্যয়ের মধ‍্যে স্থান দেননি।

পদান্বয়ী অব‍্যয়ের উদাহরণ : দ্বারা, দিয়া, কর্তৃক, জন‍্য, নিমিত্ত, হ‌ইতে, থেকে, চেয়ে, অপেক্ষা, মধ‍্যে, পাশে, উপরে, সাথে, বিনা, ছাড়া, ব‍্যতীত, তরে, লাগি ইত্যাদি।

উপরের উদাহরণগুলি লক্ষ করলে দেখা যাবে, কয়েকটি অনুসর্গে বিভক্তি আছে। যেমন, মধ‍্যে, পাশে ইত্যাদি। 


৩: সমুচ্চয়ী অব‍্যয় (Conjunction)


যে সব অব‍্যয় বাক‍্যের দুটি পদকে বা দুটি খণ্ডবাক‍্যকে জুড়ে দেয়, তাদের সমুচ্চয়ী অব‍্যয় বলে। 

তবে মনে রাখতে হবে, এই জুড়ে দেওয়ার ভাবটি সব সময় যোগ করার ভাব হয় না। বিয়োগ, সংকোচন, কারণ নির্দেশ ইত‍্যাদি অনেক প্রকার ভাব প্রকাশিত হয়। পদান্বয়ী অব‍্যয়ের সাথে এর পার্থক্য বোঝার জন‍্য একটি কথা মনে রাখলেই হবে : পদান্বয়ী অব‍্যয় Preposition-এর কাজ করে এবং সমুচ্চয়ী অব‍্যয় Conjunction-এর কাজ করে। একজনের কাজ সম্পর্ক তৈরি করা, অপরজনের কাজ একত্রিত করা। সমুচ্চয়ী অব‍্যয়ের অনেকগুলি ভাগ আছে। যেমন : সংযোজক, বিয়োজক, সংকোচক, হেতুবাচক, অন‍্যথাসূচক, সংশয়বাচক ইত‍্যাদি।


সংযোজক অব‍্যয়


যে অব‍্যয় দুটি পদ বা দুটি খণ্ডবাক‍্যকে যুক্ত করে, তাকে সংযোজক অব‍্যয় বলে। 

যেমন : ও, এবং, আর

বিয়োজক অব‍্যয়


যে অব‍্যয় দুটি বিকল্পের মধ‍্যে একটিকে প্রতিষ্ঠা করে এবং অপরটিকে খারিজ করে, তাকে বিয়োজক বা বৈকল্পিক অব‍্যয় বলে।

যেমন : "আমি যাবো অথবা রাম আসবে।" এখানে 'অথবা' বিয়োজক অব‍্যয়। অন‍্যান‍্য বিয়োজক অব‍্যয় : বা, কিংবা, না ইত্যাদি।


সংকোচক অব‍্যয়


যে অব‍্যয় দুটি খণ্ডবাক‍্যের মধ‍্যে থেকে একটি খণ্ডবাক‍্যের ভাবকে কিছুটা সংকুচিত করে, তাকে সংকোচক অব‍্যয় বলে। সংকোচক অব‍্যয় বৈপরীত্যের ভাব‌ও প্রকাশ করে।

উদাহরণ : "সে এসেছে কিন্তু আমার সাথে দেখা করেনি।" এখানে 'কিন্তু' অব‍্যয়টি তার আসার ভাবটিকে সংকুচিত করছে। বোঝা যাচ্ছে, তার উচিত ছিল বা প্রত‍্যাশিত ছিল আমার সাথে দেখা করা। 
অন‍্যান‍্য সংকোচক অব‍্যয়গুলি হল : অথচ, তবুও, তথাপি ইত্যাদি।

[ছোটোদের শেখানোর জন‍্য সমুচ্চয়ী অব‍্যয়ের উপরোক্ত ৩টি শ্রেণি উল্লেখ করলেই হয়। এই তিনটিই সমুচ্চয়ী অব‍্যয়ের মধ‍্যে প্রধান।]


হেতুবাচক অব‍্যয়


হেতুবাচক অব‍্য‍য় কারণ প্রকাশ করে। যেমন: কেননা, যেহেতু ইত্যাদি।


অন‍্যথাবাচক বা ব‍্যতিরেকাত্মক


একটি ঘটনা না ঘটলে কী হতে পারে, এইরূপ ভাব প্রকাশ করে যে অব‍্যয়, তাকে অন‍্যথাবাচক অব‍্যয় বলে। 
যেমন : তুমি আসবে ন‌ইলে আমি দুঃখ পাবো। (ন‌ইলে)। এক‌ই রকম : নতুবা, তাছাড়া, নয়তো।


সংশয়াত্মক


এই অব‍্যয়ের দ্বারা সংশয়ের ভাব প্রকাশিত হয়। 
যেমন : আমি ভয় পেয়েছিলাম পাছে কেউ জেনে যায়।
এক‌ইরকম : যদি, বুঝি।


সাপেক্ষ বা নিত‍্যসম্বন্ধী


সাপেক্ষ অব‍্যয়গুলি জোড়ায় ব‍্যবহৃত হয়। অর্থাৎ একটির সাপেক্ষে অপরটি ব‍্যবহৃত হয়। 
যেমন : যদি-তবে, যেহেতু-সেহেতু ইত্যাদি।


প্রতিষেধক বা সীমানির্দেশক


এই অব‍্যয়গুলি দুটি খণ্ডবাক‍্যের মধ‍্যে একটির ভাবকে সীমায়িত করে। যেমন : সবাই এসেছিল শুধু সে আসতে পারেনি।


অবস্থাত্মক বা ঘটনাসূচক


এই অব‍্যয়টি বাক‍্যের গোড়ায় বসে দুটি খণ্ডবাক‍্যের মধ‍্যে একটিকে অপরটির উপর নির্ভরশীল করে। উদাহরণ : যদি আবার সুযোগ পাই, ভালো করে পড়বো। (যদি)


 

ব‍্যবস্থাত্মক


এই অব‍্যয়টি কোনো ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কী ব‍্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বা হয় বা হবে তা বুঝিয়ে দেয়।

যেমন : ফিরতে রাত হবে তাই টর্চটা সঙ্গে নিলাম।(তাই)


উপমাবাচক 


উদাহরণ: মতো, যেন ইত্যাদি।



সিদ্ধান্ত‌বাচক

উদাহরণ : সুতরাং, কাজেই ।


৪: ধ্বন‍্যাত্মক অব‍্যয়


ধ্বন‍্যাত্মক শব্দগুলি বাংলা ভাষার বিশিষ্ট সম্পদ। ইংরাজির মত অতি সমৃদ্ধ একটি ভাষাতেও বোধহয় বাংলার মত এত ধ্বন‍্যাত্মক শব্দ নেই। ধ্বন‍্যাত্মক শব্দগুলি কখনও বাস্তব ধ্বনির অনুকরণে সৃষ্টি হয় আবার কখনও ধ্বনির ব‍্যঞ্জনা দেয়।ধ্বন‍্যাত্মক শব্দগুলি অব‍্যয় হিসেবে গণ‍্য হয়। তবে এ নিয়ে মতভেদ আছে।  এই প্রসঙ্গে একটি কথা স্পষ্ট করে দেওয়া দরকার, অনেকে ধ্বন‍্যাত্মক ও অনুকার শব্দকে এক করে ফেলেন। অনুকার শব্দ আলাদা জিনিস। একটি শব্দের সাথে ধ্বনির মিল রেখে যে সব অর্থহীন শব্দ তৈরি করা হয়, তাদের অনুকার শব্দ বলে। যেমন : 'জল-টল' শব্দে 'টল'। অপরদিকে থপথপ, দুমদাম, হুড়হুড়, কটকট, ঝাঁঝাঁ, কুচকুচ প্রভৃতি শব্দগুলি ধ্বন‍্যাত্মক শব্দ। ধ্বন‍্যাত্মক শব্দগুলি অনেক ক্ষেত্রে বিশেষণ, ক্রিয়াবিশেষণ প্রভৃতি পদের ভূমিকা পালন করে। একটি ধাতুর পূর্বে‌ই সাধারণত এরা ব‍্যবহৃত হয়। এই কারণেই এদের অব‍্যয় হিসেবে গণ‍্য করা নিয়ে মতভেদ আছে।


[সূচিপত্রে যেতে এখানে ক্লিক করুন।]






2 comments: