অনন‍্য-বাংলা : একটি ব‍্যাকরণের ব্লগ

Sunday, September 2, 2018

স্বরধ্বনি

স্বরধ্বনি সম্পর্কে ধারণা


ধ্বনির আলোচনায় বিভাজ‍্য ধ্বনির‌ই গুরুত্ব বেশি। অবিভাজ‍্য ধ্বনি ঠিক ব‍্যাকরণের আলোচনার বিষয় নয়। তাই এখন আমরা বিভাজ‍্য ধ্বনির দুটি শ্রেণী, স্বরধ্বনি ও ব‍্যঞ্জনধ্বনির প্রসঙ্গে আসব। আজকের আলোচনায় আমরা স্বরধ্বনি‌ সম্পর্কে বিস্তারিত জানব।

স্বরধ্বনি কাকে বলে?

স্বরধ্বনি কাকে বলে, এ বিষয়ে একটি পুরাতন সংজ্ঞা প্রচলিত আছে---- "যে ধ্বনিকে অন‍্য ধ্বনির সাহায্য ছাড়াই উচ্চারণ করা যায়, তাকে স্বরধ্বনি বলে।" স্বরধ্বনির এই সংজ্ঞাটি ভুল নয়। তবে ভাষাতাত্ত্বিক সংজ্ঞা এটি নয়। স্বর উচ্চারণের পদ্ধতিটি এই সংজ্ঞা‌য় স্পষ্ট হয় না। স্বর সম্পর্কে সম‍্যক একটি ধারণাও পাওয়া যায় না (সংজ্ঞা মানে 'সম‍্যক জ্ঞান')। অপরদিকে ভাষাতাত্ত্বিক সংজ্ঞা এই শর্তটি মোটামুটি পূরণ করে।

স্বরধ্বনি কী, তা জানার আগে আমাদের জেনে নেওয়া প্রয়োজন যে, ধ্বনি সৃষ্টি হয় কী ভাবে। ধ্বনি সৃষ্টির জন‍্য প্রথমে আমাদের ফুসফুস থেকে আমরা নিঃশ্বাসবায়ু  নির্গত করি। এই বায়ুর গতিপথে প্রথমে পড়ে স্বরতন্ত্রী নামে দুটি পাতলা পর্দা। এই পর্দাগুলি থাকে আমাদের স্বরকক্ষের মধ‍্যে। এগুলি প্রয়োজন মত কাছাকাছি বা পরস্পরের থেকে দূরে যেতে পারে। এদের মধ‍্য দিয়ে যখন বায়ু প্রবাহিত হয়, তখন এগুলি কাঁপতে থাকে। তবে এই কম্পন থেকে সব সময় ধ্বনি উৎপন্ন না‌ও হতে পারে। কেন হবে না, সে প্রসঙ্গে এখন যাচ্ছি না। আপাতত এটুকু আমরা বুঝলাম যে, স্বরতন্ত্রীর মধ‍্য দিয়ে বায়ু প্ররবাহিত হলে সেখানে কম্পন হবে এবং কম্পনের  ফলে ধ্বনি উৎপন্ন হতে পারে বা ঠিকমত কম্পন না হলে শ্রবণযোগ‍্য ধ্বনি উৎপন্ন নাও হতে পারে। এ ছাড়া নিঃশ্বাস‌বায়ুকে বাগযন্ত্রের অন‍্যত্র অর্থাৎ মুখগহ্বরের কোনো অংশে বাধা দিলে বায়ু সেই বাধা অতিক্রম করে প্রবাহিত হয়। এই অতিক্রম করার সময়‌ও ধ্বনি সৃষ্টি হতে পারে।

এইবার আমরা আসি স্বরধ্বনি‌র জন্ম প্রসঙ্গে। উপরের দুটি পদ্ধতির মধ‍্যে প্রথম পদ্ধতিটিতে স্বরধ্বনি‌র জন্ম হয়। অর্থাৎ, শ্বাসবায়ু স্বরতন্ত্রীর মধ‍্য দিয়ে প্রবাহিত হবার সময় পর্দা দুটি এমনভাবে কাঁপে যে শ্রবণযোগ‍্য ধ্বনি সৃষ্টি হয়। এবার মুখগহ্বরের আকার আকৃতির বদল ঘটিয়ে আমরা স্বরতন্ত্রীতে সৃষ্ট স্বরে নানা বৈচিত্র্য নিয়ে আসি। কিন্তু পুরো প্রক্রিয়াতে শ্বাসবায়ু কোথাও এমন বাধা পায় না, যে প্রবাহিত হ‌ওয়ার জন‍্য তাকে ঐ বাধা অতিক্রম করতে হয়। উদাহরণ দিলে বিষয়টা স্পষ্ট হবে: ধরি, অ এবং আ, এই দুটি স্বর আমরা উচ্চারণ করছি। এই দুই ক্ষেত্রেই ধ্বনির জন্ম হচ্ছে স্বরতন্ত্রীতে। কম্পনের মাত্রা‌ও দুই ক্ষেত্রে প্রায় এক। তাহলে আমরা দুটি আলাদা ধ্বনি শুনছি কেন? এর জন‍্য দায়ী দুই ক্ষেত্রে মুখবিবরের আলাদা আলাদা আকৃতি। এরকম ভাবে মুখের আকার বদলিয়ে আমরা আর‌ও বেশ কয়েকটি স্বর উচ্চারণ করতে পারি। এখন আশা করি স্বরের জন্ম-প্রক্রিয়া মোটামুটি স্পষ্ট হল। এবার আমরা স্বরের সংজ্ঞা নিরূপণ করতে পারব সহজেই।

সুতরাং স্বরধ্বনি‌র সংজ্ঞা আমরা এইভাবে দিতে পারি :

যে ধ্বনিকে উচ্চারণ করার সময় শ্বাসবায়ুকে বাগযন্ত্রের কোথাও উল্লেখযোগ্য বাধা দিতে হয় না এবং শ্বাসবায়ু মুখবিবরের মধ‍্য দিয়ে প্রায় বিনা বাধায় প্রবাহিত হয়, তাকে স্বরধ্বনি বলে।
স্বরধ্বনি‌র একটি বড় বৈশিষ্ট্য হল, এরা অন‍্য ধ্বনির সাহায্য ছাড়াই উচ্চারিত হতে পারে।


বাংলা মৌলিক স্বর:

বাংলা বর্ণমালা‌য় ১১টি স্বর দেখা যায়। কিন্তু এদের মধ‍্যে সবাই মৌলিক স্বর নয় এবং একটি মৌলিক স্বর উচ্চারণে থাকলেও বর্ণমালায় নেই।
বাংলায় মৌলিক স্বর ৭টি: ই, উ, এ, ও, অ্যা, অ, আ ।
অ্যা স্বরটি উচ্চারণে ব‍্যবহৃত হলেও বাংলা বর্ণমালায় এর জন‍্য স্বতন্ত্র অক্ষর নেই। ভবিষ্যতে এর জন‍্য আলাদা একটি বর্ণ এবং সংক্ষিপ্ত চিহ্ন(বা 'কার') তৈরি হ‌ওয়া দরকার বলে আমরা মনে করি।

বাংলা মৌলিক স্বরগুলির বিস্তৃত পরিচয় আমরা পরবর্তী পর্বে আলোচনা করব।


যৌগিক স্বরধ্বনি :


একাধিক মৌলিক স্বরধ্বনির যোগে যে স্বরগুচ্ছ তৈরি হয়, তাকে যৌগিক স্বরধ্বনি বলে। যৌগিক স্বরধ্বনি সম্পর্কে অনেক ভ্রান্ত ধারণা বাংলা ভাষায় চালু আছে। 

প্রথম ভুল ধারণা : "বাংলায় যৌগিক স্বরধ্বনি ক'টি ?" এই প্রশ্নের উত্তরে। বাংলা বর্ণমালায় মাত্র ২টি যৌগিক স্বর স্থান পেয়েছে। তাদের সংক্ষিপ্ত চিহ্ন‌ও (বা 'কার') চালু আছে। ঐ‌‌(অ+ই---কৈ) এবং ঔ (বৌ)। কিন্তু প্রকৃত বিচারে এই দুটি ছাড়াও বাংলায় আর‌ও অনেকগুলি যৌগিক স্বর আছে। যেমন : ইএ(ইয়ে), উআ(উয়া), আউ, আও, ওই, ওই, আই ইত‍্যাদি। এগুলি দ্বিস্বর ধ্বনির মধ‍্যে পড়ে। দ্বিতীয় ভুল ধারণা: যৌগিক স্বর মাত্রই দুটি স্বরের সমষ্টি। কিন্তু বাস্তবে বাংলাভাষায় দ্বিস্বর ছাড়া ত্রিস্বর, চতুঃস্বর, এমনকি পঞ্চস্বর‌ও বহাল তবিয়তে উচ্চারিত হয়। এগুলিও যৌগিক স্বর।

ত্রিস্বরের উদাহরণ : আইআ(আইয়া) যেমন: 'খাইয়া' , 'যাইয়া' প্রভৃতি শব্দে। 

চতুঃস্বরের উদাহরণ : আইআই (যেমন: খাইয়াই শব্দে)

পঞ্চস্বরের উদাহরণ: আওআইআ( যেমন: খাওয়াইয়া)। 


ভাষায় স্বরধ্বনি‌র গুরুত্ব


যে কোনো ভাষাতেই স্বরধ্বনিগুলিই ভাষার সবচেয়ে বড় সম্পদ। আমাদের বাগযন্ত্র শুধু স্বরকেই স্পষ্ট ভাবে উচ্চারণ করতে পারে;  ব‍্যঞ্জনকে পারে না। ভাত না থাকলে যেমন তরকারির (তরকারিও 'ব‍্যঞ্জন') কোনো গুরুত্ব থাকে না, তেমনি স্বর ছাড়া ব‍্যঞ্জন অচল। স্বরের ঘাড়ে চেপেই ব‍্যঞ্জন‌গুলি তাদের উচ্চারণ-বৈতরণী পার হয়। একটি স্বরের ঘাড়ে এক এক সময় তিন-চারটি ব‍্যঞ্জন‌ও চেপে বসে। উচ্চারণ ক্রিয়াটি তখন আমাদের পক্ষে‌ও গুরুভার হয়ে পড়ে।

যেমন: 'স্ত্রী' শব্দটি দেখতে ছোটোখাটো, কিন্তু এতে একা ঈ-এর ঘাড়ে চেপে আছে স্, ত্, র্, তিনটি ব‍্যঞ্জন। ইংরাজি Bricks শব্দের মধ‍্যে একটি স্বর আছে-- ই। ব‍্যঞ্জন আছে ব্,র্,ক্,স্... মানে ৪টি। 

 ব‍্যঞ্জন‌গুলি আসলে স্বরকেই বৈচিত্র্য প্রদান করে। স্বরের সাথে ভিন্ন ভিন্ন ব‍্যঞ্জন মিশ্রিত হয়ে ভিন্ন ভিন্ন ধ্ববনিযূথ গঠন করে। সেই যূথের ভরকেন্দ্রে থাকে স্বর। ব‍্যঞ্জনের উচ্চারণে সময় লাগে অতি অল্প। সময় যা লাগে তা মূলত ঐ স্বরধ্বনি‌র জন‍্য‌ই। এই জন‍্য 'ঈ' বললেও হয় এক মাত্রা আবার 'স্ত্রী' বলললেও এক মাত্রা। (মাত্রা বলতে বোঝায় উচ্চারণ-যোগ‍্য ন‍্যূনতম ধ্বনিপরিমাণ বা ধ্বনিগুচ্ছ উচ্চারণ করতে ব‍্যয়িত সময়)। 

[সব পোস্ট দেখতে এখানে ক্লিক করে সূচিপত্রে যান।]

No comments:

Post a Comment